বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক সায়মা ওয়াজেদ পদত্যাগ করেছেন।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানায়, জাতিসংঘ সংস্থা এবং বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের জালিয়াতির তদন্তের মুখে তিনি এই পদত্যাগপত্র জমা দেন।
সায়মা ওয়াজেদের এই ঘটনাটি নির্দেশ করে যে, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার পতনের পর এর প্রভাব কেবল তার রাজনৈতিক সহযোগীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। শেখ হাসিনার অনেক সহযোগীই বাংলাদেশে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হচ্ছেন অথবা তার মতো আত্মগোপনে আছেন।
সায়মা ওয়াজেদ ২০২৪ সালের শুরুর দিকে পাঁচ বছর মেয়াদে ডব্লিউএইচও-র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালকের দায়িত্ব নেন। তবে জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগে শেখ হাসিনা-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনস্থ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত বছরের মার্চে তার বিরুদ্ধে মামলা করার পর, তাকে ডব্লিউএইচওর পক্ষ থেকে বিনা বেতনে প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠানো হয়।
রয়টার্সের দেখা গত ৩ জুলাই ২০২৬ তারিখের এক চিঠিতে জানা যায়, ডব্লিউএইচও সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে চীন ভ্রমণের ক্ষেত্রে আর্থিক জালিয়াতি এবং তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ এনেছিল। তবে সায়মা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ডব্লিউএইচও মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসুসকে দেওয়া পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ উল্লেখ করেন, সংস্থাটি তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে অবৈধভাবে জমি অধিগ্রহণের অভিযোগও এনেছে।
সায়মা বলেন, ডব্লিউএইচওতে যোগ দেওয়ার আগেই তিনি সেই জমি অধিগ্রহণ করেছিলেন এবং বাংলাদেশের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের জন্য নির্ধারিত আইনের আওতায় তিনি এই জমির হকদার ছিলেন।
টেড্রোসকে পাঠানো পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ লিখেছেন, আমার অঞ্চলের দেশগুলোর সেবা করার জন্য আমি আঞ্চলিক পরিচালক পদে নির্বাচিত হয়েছিলাম এবং তা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে করেছি। কিন্তু আপনি যেহেতু আমাকে আমার দায়িত্ব পালনে ধারাবাহিকভাবে বাধা দিয়ে আসছেন, তাই ডব্লিউএইচওতে আপনার নেতৃত্বের ওপর আমি সব আস্থা হারিয়েছি।
তিনি আরও লেখেন, তদুপরি, আমাকে বিনা বেতনে ছুটিতে পাঠানোর আপনার সিদ্ধান্তের পর প্রায় এক বছর ধরে কোনো বেতন না পাওয়ায় আমার আর্থিক পরিস্থিতি এখন চরম সংকটাপন্ন। এই পরিস্থিতিতে আমি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।
এ বিষয়ে সায়মা ওয়াজেদ অতিরিক্ত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ডব্লিউএইচওর কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র আগে জানিয়েছিল যে, জাতিসংঘ সংস্থাটি সায়মা ওয়াজেদকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছিল।
এর মধ্যে একটি সূত্র জানায়, ডব্লিউএইচও আগামী ১২ অক্টোবর এই পদের জন্য মনোনয়ন ঘোষণা করবে, ডিসেম্বরে আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করবে এবং ২৪ জানুয়ারি নতুন নির্বাচন আয়োজন করবে।
আঞ্চলিক পরিচালকরা বিশ্ব স্বাস্থ্য নীতি নির্ধারণে অত্যন্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তা, যাদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে মহামারির মতো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করা এবং স্থানীয় পরিস্থিতির সাথে ডব্লিউএইচও-র নীতিমালার সামঞ্জস্য রক্ষা করা। বাংলাদেশ ও ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সদস্য রাষ্ট্রগুলো প্রতি পাঁচ বছর পর পর এই পদের জন্য প্রতিনিধি নির্বাচিত করে।
জুলাই মাসের চিঠিতে সায়মা ওয়াজেদ তার আইনজীবীদের মাধ্যমে যাতায়াত খরচের জালিয়াতির বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, এটি সাধারণ রিইমবার্সমেন্ট প্রক্রিয়াকরণের সময় একজন সহকারী দ্বারা হওয়া একটি প্রশাসনিক ভুল ছিল এবং যার আর্থিক পরিমাণ ছিল মাত্র ৯০১ ডলার।
আর শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়ে তিনি জানান, বাংলাদেশে অটিজম বিষয়ে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একটি সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছেন এবং টেড্রসের কাছে এই যোগ্যতার বিষয়টি তিনি শুরু থেকেই স্পষ্ট রেখেছিলেন। সূত্র: রয়টার্স